বগুড়ার আকবরিয়া হোটেল শতবর্ষ ধরে অসহায় মানুষদের বিনামূল্যে খাওয়াচ্ছে

যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছেন, সেদিন থেকে আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলে রাতের খাবার বিনা পয়সায় খেয়ে যাচ্ছেন। হোটেল থেকে একেক দিন একেক ধরনের খাবার দেওয়া হয়। সাদা গরম ভাতের সঙ্গে কোনো দিন মাছ, মাংস আবার কোনো দিন ডিম-সবজি। প্রতি রাতে তিনি তার বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে আসেন রাতের ক্ষুধা নিবারণের জন্য। কথাগুলো বলছিলেন স্বামী পরিত্যক্তা ছিন্নমূল রূপালী বানু। দিনের দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তা না থাকলেও রাতের খাবার ঠিকঠাক পাবেন, এটা তাকে স্বস্তি দেয়। সাদা দাড়ি, পাকা সোনালী উশকোখুশকো চুল, চোয়াল ভাঙা প্রায় ৬০ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ। নাম আলমগীর। জন্ম বস্তিতে হওয়ায় শিশুকাল থেকেই জীবন কাটছে পথে পথে। ভাংড়ি কুড়িয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কোনো দিন পয়সা উপার্জন করতে পারলে দিনের এক বেলা খাবার জোটে, উপার্জন করতে না পারলে থাকতে হয় না খেয়ে। ক্ষুধা পেট নিয়ে আলমগীর অপেক্ষা করেন রাতের। কারণ, দিন শেষে তার ক্ষুধার জ্বালা মেটাবার একমাত্র স্থল আকবরিয়া। সারাদিন খেয়ে না খেয়ে থাকলেও ২৫ বছর ধরে রাতের খাবার নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হয় না। খাবার আমাদের পলিথিনে করে দেওয়া হয়। যে পরিমাণ খাবার দেয় ওই খাবার দুজন মানুষের পেট ভরবে। প্রতিরাতে যে গরম ভাতের সঙ্গে সবজি, ডাল, মাছ দিলেও মাঝেমধ্যে পোলাও-মাংসও খেতে দেয়। আমরা গরিব মানুষ। আয় রোজগার কম। ৩০ বছর ধরে আকবরিয়াতে বিনা পয়সায় খাচ্ছি, কথাগুলো বলছিলেন দিনমজুর দুলাল। শুধু রূপালী, আলমগীর এবং দুলাল নন, তাদের মতো আরও শত শত ছিন্নমূল, ফকির, মিসকিন এবং মুসাফিরদের জন্য বিনা পয়সায় রান্না করা রাতের খাবার বিতরণ করছে বগুড়ার আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল কর্তৃপক্ষ। ১০৯ বছর যাবত নিয়ম করে ছিন্নমূল এবং অসহায় দুস্থ মানুষের রাতের খাবার দিয়ে যাচ্ছেন। শুধু শবে বরাত আর দুটো ঈদের দিন রাতের বেলায় এই খাবার বিতরণ বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া বছরের প্রতিটি দিন এই মানুষের জন্য খাবার বিতরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এর শুরুটা করেছিলেন আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আকবর আলী। সময়টা ছিল ১৯১২ সাল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আকবর আলী নিজে অসহায় এসব মানুষের রাতের খাবার দিতেন। যারা তার হোটেলে রাতের খাবার খেতে আসতেন, তাদের তিনি অতিথি মনে করতেন।
আকবরিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা আকবর আলীর জন্ম তৎকালীন ভারতের মুর্শিদাবাদে। পারিবারিক কলহের কারণে এক সময় তিনি সপরিবারে বাংলাদেশের পাবনার পাকশিতে আসেন। এরপর বগুড়ার সান্তাহার এবং পরে বগুড়া শহরে আসেন। সময়টা ১৯০৪ কি ১৯০৫ হবে। সে সময় বগুড়াতে মুসলমানদের জন্য কোনো খাবার হোটেল ছিল না। ওই সময়টাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের হোটেলে মুসলমানরা যেত না। আবার হিন্দুরা তাদের হোটেলের আসবাবপত্র মুসলমানদের ছুঁতে দিত না। তখন তার মাথায় মুসলমানদের খাবারের জন্য হোটেল পরিচালনার বিষয়টি কাজ করে। কিন্তু হোটেল দেওয়ার তো প্রয়োজনীয় অর্থ তার কাছে ছিল না। তিনি মিষ্টি বানাতে জানতেন। তখন তিনি মিষ্টি বানিয়ে ফেরি করে বিক্রি করা শুরু করলেন। এক সময় তার কিছু টাকা পুঁজি হলে তিনি ১৯১১ সালে শহরের চকযাদু রোডে মাসিক ৮ টাকা ভাড়ায় একটি ঘর নিয়ে হোটেল ব্যবসা শুরু করেন। বগুড়া শহরের একমাত্র মুসলমানদের খাবার হোটেল হওয়ায় এবং খাবারের মান ভালো হওয়ায় তার হোটেলের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তার রমরমা ব্যবসা শুরু হয়। পরে তিনি চকযাদু রোড থেকে তার হোটেল বর্তমান থানা রোডে স্থানান্তর করেন। মরহুম আকবর আলী ৪০ থেকে ৬০ এর দশক পর্যন্ত হোটেলে মাসিক ১৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যে তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করে দিতেন। সে সময় ঘি দিয়ে রান্না করা বিরিয়ানির দাম ছিল এক টাকা প্লেট। আকবর আলী ধর্মভীরু ছিলেন। অল্প সময়ে তার ব্যবসার প্রসার ভালো হওয়ায় এটিকে তিনি সৃষ্টিকর্তার নেয়ামত হিসেবে দেখতেন। যে কারণে তার হোটেলের প্রতিদিনের আয়ের একটি অংশ থেকে প্রতি রাতে গরীব, মুসাফির, ভিক্ষুক, মিসকিনদের খাওয়ানো শুরু করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই কাজটি করে গেছেন। আকবর আলী মারা যান ১৯৭৫ সালে। মৃত্যুর আগে তিনি তার সন্তানদের হোটেলের আয় থেকে মুসাফির, ভিক্ষুক, গরীবদের খাওয়ানোর কথা বলে নির্দেশ দিয়ে যান। তার নির্দেশ সন্তানরা এখনো পালন করে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক শামীম তালুকদার বলেন, ‘আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আছি। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই দেখছি ছিন্নমূল এবং গরিব মানুষকে প্রতি রাতে বিনা পয়সায় খাওয়ানো হয়। যতজন মানুষই আসুক, প্রত্যেককে খাবার দেওয়া হয়। কোনো দিন খাবার কম হয় না। যদি কখনো খাবার শেষ হয়ে যায়, একজন মানুষও বাকি থাকে, তার জন্য আবারো খাবার রান্না করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে আমাদের। যতটুকু জানি মরহুম আকবর আলী সাহেব তার সন্তানদের বলে গেছেন, যতদিন এই হোটেল থাকবে, তত দিন এই মানুষকে রাতের খাবার দিতে হবে।’ শামীম আরও বলেন, ‘এত মানুষের জন্য ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্রি বিতরণের নজির বগুড়া কেন বাংলাদেশের আর কেউ করে কিনা আমার জানা নেই। তবে সমাজের বিত্তবানদের এমন কাজ করা উচিত।’প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হাসান আলী আলাল রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘বাবার নির্দেশ ছিল হোটেল থেকে আয়ের টাকায় তোমরা যদি একবেলা খাও, তাদের জন্য এক বেলা খাবারের ব্যবস্থা করবে। হোটেলটি যত দিন থাকবে, তত দিন এটা করবে। বাবার নির্দেশ আমরা পালন করছি। এছাড়া শহরের ভেতরে যতগুলো মসজিদ আছে, সেই মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খতিবদের তিনবেলা বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আকবরিয়ার স্টাফদের জন্য যে খাবার রান্না করা হয়, সেই খাবার তাদেরও দেওয়া হয়। আমার দাদা খোশজান আলীর নামে শহরে ৮০টির মতো মক্তব আছে। যেখানে কুরআন ও নামাজ শিক্ষা দেওয়া হয়। আবার আকবরিয়া কেয়ার ফাউন্ডেশন গঠন করেছি আমরা। এটিরও কাজ চলছে। কেয়ার ফাউন্ডেশনের মূল কাজ হলো ছিন্নমূল-অসহায় গরিবদের বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা। মানুষকে কর্মক্ষম করে বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করা। মূল লক্ষ্য মানুষের উন্নয়ন করা।’

 

Comments: