সুরা মসজিদ-সুলতানি আমলে নির্মিত এক মসজিদের গল্প

৪০০ বছর আগের তৈরি সুলতানী আমলের সুরা মসজিদ। যেটি দিনাজপুর জেলার হিলি-ঘোড়াঘাট সড়কের চোরগাছা নামক স্থানে অবস্থিত। প্রতিদিন বহু দুর-দুরন্ত থেকে শতশত মানুষ আসে নামাজ আদায় করতে। আবার আল্লাহর নামে অনেকেই মান্নত করেন এই মসজিদে এবং তার ফলও পান তারা। এলাকার জনশ্রæতি রয়েছে সুলতানী আমলে এক রাতেই এই মসজিদটি তৈরি হয়েছে। সুলতানী আমলের বিরল স্থাপত্য কীর্তি সুরা মসজিদটি প্রধানত দুটি অংশে বিভক্ত। একটি নামাজ ঘর ও একটি বারান্দা। নামাজ ঘরের পরিমাণ ৭.৮৪ ও ৭.৮৪ মিঃ এবং বারান্দা ৪.৮৪ মিঃ লম্বা ও ২.১২ মিঃ চওড়া।চুন সুরকীর সাহায্যে  ছোট আকৃতির ইট দিয়ে নির্মাণ হয়ে দেওয়াল, যা ১.৮০ মিঃ প্রশস্ত।  নামাজ ঘরটির ছাদ অর্ধগোলায়ীত গম্বুজ দ্বারা আবৃত। বারান্দায় রয়েছে এক সারিতে অনুরুপ ৩টি গম্বুজ । নামাজ ঘরের ৪ কোণে ৪টি ও বারান্দায় ২টি পাথরের বুরুজ রয়েছে। মসজিতে প্রবেশের জন্য পূর্বদিকে ৩টি ও উত্তর-দক্ষিণে ১টি করে খিলানকুত প্রবেশ রয়েছে। বারান্দার উভয় পাশেও ১টি করে প্রবেশ পথ আছে। মসজিদের ভিতর কিবলা দেওয়ালে ৩টি অলংকৃত  পাথরের তৈরি অবতল মিহরাব রয়েছে। বহিঃগাত্রে ২ সারি অলংকৃত ইটের প্যানেল নক্সা ও এর মধ্যবর্তী স্থানে পাথরের মন্ডিংব্যান্ড রয়েছে,যা সমসাময়িক সুলতানী আমলের মসজিদ স্থাপত্য হিসেবে লক্ষ্য করা যায়।স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী এটি হোসেন শাহী (খ্রি,ষোল শতক) আমলের নিদের্শন। মসজিদটির উত্তর দিকে একটি ঈদগা মাঠ রয়েছে, যেখানে দুই ঈদে মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায় করেন। ঈদগায়ের সাথে দুইটি পুরনো তেঁতুলের গাছ আছে, তবে কত বয়স এই গাছের তার সঠিক বয়স বলতে পারে না স্থানীয়রা। মসজিদের একেবারে উত্তরে একটি বিশাল পুকুর রয়েছে, যেখানে মসজিদে মান্নত করতে আসা মানুষ ওযু এবং গোসল করেন। নামাজিদের জন্য একটি ওযুখানা আছে। রাস্তার সাথে লাগানো একটি দান বক্স রয়েছে। রাস্তা দিয়ে পথচারীরা ও বাসের যাত্রীরা দান খয়রাত করে থাকে। গাইবান্ধা থেকে আসা অন্তর বাবু বলেন, এই প্রথম এই মসজিদ দেখতে আসলাম। মানুষের মুখে এই মসজিদের অনেক কথা শুনে আসছি। আজ এসে বুঝতে পারলাম, আল্লাহর ঘরটি আসলেই দেখার মতো। এখানে এসে খুবি ভাল লাগছে, আসছি সকালে, বেলা গড়ে, গেছে তবুও মন চাইছে না এখান থেকে যেতে। ঘোড়াঘাট উপজেলার উসমানপুর গ্রামের মোস্তফা হোসেন বলেন, পাশের গ্রামে আমার বাড়ি, প্রতি সপ্তাহে একদিন করে আসি। এটা আমার ছোট বেলার অভ্যাস। যখন ভাল লাগে না তখন আমার সহধর্মীনিসহ আসি। আল্লাহর ঘর, খুবি শান্তির জায়গা। ৮৫ বছর বয়সী স্থানীয় তাছির উদ্দিন বলেন, এটি খুব পুরনো মসজিদ। বাপ-দাদারে নিকট এই মসজিদ সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। তারা বলতেন এই আল্লাহর ঘরটি এক রাতেই তৈরি হয়েছে। এই মসজিদে আমি বাপ-দাদাদের সাথে নামাজ পড়ে আসছি, আজও নামাজ পড়ি এবং যতদিন বাঁচব ততদিন নামাজ পড়বো। মসজিদে মান্নত করতে আসা জমিলা বেগমের সাথে কথা হয়,তিনি বলেন, আমি আমার ছেলের অসুস্থতার জন্য মান্নত করতে এসেছি। মানুষের মুখে শুনেছি আল্লাহর নামে কোন উদ্দেশ্য করে মান্নত করলে সেটি সফল হয়। তাই আজ মাংস দিয়ে খেচুড়ি রান্না করে সবাইকে খাওয়াচ্ছি। হিন্দু ধর্মাবলম্বী শ্রী হরিদাস মহন্তকে দেখা যায় এক প্যাকেট মোমবাতি মসজিদের গেটে রাখছে। কথা হয় হরিদাস মহন্তের সাথে,তিনি বলেন, আল্লাহর ঘর মসজিদটি খুব জাগ্রত। আমার যখনি শরীরের কোন অসুখ হয়, তখনি এই আল্লাহর ঘরে কিছু মান্নত করি এবং আমি সুস্থ্য হয়ে যায়।  মসজিদের খাদেম মিজানুর রহমান বলেন, এই মসজিদে আমার বাপ-দাদারা খাদেম ছিলেন। তাদের পর আমিও দায়িত্ব পালন করে আসছি। প্রতিদিন বহু দুরদুরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এই মসজিদটি দেখতে। আবার অনেকেই মান্নত করে রান্নাবান্ন করে সবাইকে খাওয়ায়। অনেকেই আবার টাকাসহ অন্যান্য জিনিসও দান করেন। সুরা মসজিদের ইমাম মতিয়ার রহমান বলেন, দীর্ঘদিন যাবৎ এই মসজিদে আমি ইমামতি করে আসছি। আল্লাহর ঘর মসজিদে অনেক দুর থেকে দুই রাকাত নামাজ পড়তে আসে। অনেকেই আবার দান খয়রাত করেন তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য।

 

Comments: