এবারও মেলা পাচ্ছে না শখের হাঁড়ি

 দুয়ারে কড়া নাড়ছে পয়লা বৈশাখ। অথচ সুশান্ত পালের ব্যস্ততা নেই। কারণ, এবারও বসবে না বৈশাখী মেলা। প্রায় ৩১ বছর ধরে শখের হাঁড়ি তৈরি করে আসা সুশান্ত পাল দুবারই এমন চিত্র দেখলেন। গতবছর করোনা ভাইরাসের কারণে বাঙালীর প্রাণের মেলা বসেনি। এবারও তাই। রাজশাহী শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে পবা উপজেলার বসন্তপুর গ্রামে সুশান্ত কুমার পালের বাড়ি। শুক্রবার (২ মার্চ) পড়ন্ত বিকালে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনের মোড়ের দোকানেই বসে আছেন সুশান্ত পাল। বাড়ির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘এবারও তো কাজ নাই। তাই দোকানে বসে ছিলাম।’ সুশান্ত পাল শখের হাঁড়ি তৈরির কারিগর হয়েছেন বংশগতভাবেই। তার বয়স এখন ৬০। প্রায় ৩১ বছর ধরে নিজের হাতে তৈরি করছেন শখের হাঁড়ি। নিভৃত গ্রামের এই কারুশিল্পীর নাম ছড়িয়েছে দেশব্যাপী। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে ‘শখের মৃৎশিল্প’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধের সঙ্গে ছাপানো হয়েছে সুশান্ত পালের ছবি। সরকারি খরচে দেশের প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছেন বিদেশেও। কারুশিল্পের এক প্রদর্শনীতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হয়ে ২০১৩ সালে সুশান্ত পাল গিয়েছিলেন জাপান। তিনি একাধিকবার দেশের সেরা কারুশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন। কারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদ, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, জাতীয় জাদুঘর, কারিকা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনসহ (বিসিক) আরও নানা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সনদ রয়েছে তার। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী হিসেবে ২০১১ সালে স্বর্ণপদক পান সুশান্ত পাল। বিসিক নকশা কেন্দ্রের ‘আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকা’ জাতীয় মৃৎশিল্প প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ প্রতিযোগী হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন। শুধু বিসিকই সুশান্ত পালকে দুইবার শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী নির্বাচিত করেছে। সুশান্ত কুমার পালের ছেলে সঞ্জয় কুমার পালও সরকারি খরচে ২০১৬ সালে শ্রীলঙ্কায় প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। কারুশিল্পের আরেক প্রদর্শনীতে ২০২০ সালে গিয়েছেন নেপাল। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশে যেখানেই কারুশিল্পের মেলা বা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়, সেখানেই সুশান্ত পাল আর তার দুই ছেলেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অসংখ্য প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন তারা। সর্বশেষ গেল মার্চ মাসজুড়ে সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে আয়োজিত লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব থেকে অংশ নিয়ে এসেছেন তারা। কিন্তু তাতে মন ভরেনি। বৈশাখী মেলা তাদের বিশেষভাবে টানে। দুবছর ধরে এ মেলায় যেতে না পেরে তাদের মন খারাপ। শুক্রবার সন্ধ্যায় বাড়ির উঠোনে বসে সুশান্ত কুমার পালের ছেলে সঞ্জয় কুমার জানালেন, করোনার কারণে সোনারগাঁয়ে মেলায় তেমন বেচাবিক্রি হয়নি। শখের হাঁড়ি ফেরত এসেছে। করোনাকাল না হলে কিছুই ফিরে আসত না। মেলা শেষের আগেই তাদের শখের হাঁড়ি শেষ হয়ে যেত। বৈশাখী মেলার প্রস্তুতি নিতে বাড়িতেও চলত কর্মযজ্ঞ। দুবছর ধরে চিত্র ভিন্ন। সঞ্জয় কুমার পাল ও তার ভাই মৃত্যুঞ্জয় কুমার পাল কারুশিল্পী হয়ে উঠেছেন বাবা সুশান্ত কুমার পালকে দেখে দেখে। সুশান্ত পাল শিখেছিলেন তার বাবা বাবা ভোলানাথ কুমার পালের কাছে। ভোলানাথ মারা গেছেন। সুশান্তের স্ত্রী মমতা রানী পাল, মেয়ে সুচিত্রা রানী পাল এবং দুই ছলের স্ত্রী মুক্তি রানী পাল ও করুণা রানী পালও এখন কারুশিল্পী। প্রতিবছর বৈশাখের আগে তাদের ব্যস্ততার সীমা থাকে না। দিনরাত এক করে তারা কাজ করেন। করোনার থাবায় এবার কারও কোন ব্যস্ততা নেই। গতবছরও একই অবস্থা ছিল। বাড়িতে এখন তাদের হাঁড়ি-সাজি, পঞ্চসাজি, চুকোই, মাটির পুতুল, ঘোড়াসহ অন্যান্য মাটির তৈজসপত্রের মজুতও কম। অথচ এই বাড়িরই ঘরে ঘরে, বারান্দা আর আঙ্গিনায় দৃষ্টিনন্দন এসব জিনিসপত্র আগে সাজিয়ে রাখা হতো। শুক্রবার বিকালে সুশান্ত পালের বাড়ির উঠোনে কিছু শখের হাঁড়ি সাজিয়ে রাখা দেখা যায়। সুশান্ত পাল জানালেন, শনিবার সকালে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা তার বাড়ি পরিদর্শনে আসবেন। সে কারণে এসব বের করে রাখা হয়েছে। সুশান্ত বললেন, লম্বা সময় ধরে বসে বসে হাঁড়ি তৈরির কাজ করার কারণে কোমরে-পায়ে ব্যাথা হয়েছে। এখন চলতে হয় লাঠি নিয়ে। উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছেন না। করোনার কারণে সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। গত শনিবার সকালে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. আহমেদ উল্লাহ ও উপ-পরিচালক মো. রবিউল ইসলাম সুশান্তের বাড়ি পরিদর্শনে যান। তাদের সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও ছিলেন। তারা সুশান্তের কারুকাজের প্রশংসা করেন। জরিপের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। দুপুর পর্যন্ত তারা সুশান্তের বাড়িতে ছিলেন।

 

Comments: