মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর: গুরুত্ব ও ফযিলত

লাইলাতুল কদর : কুরআনে কারীমে এ রাত্রিকে লাইলাতুল মুবারাকাহ ও বলা হয়েছে।
এই রাতের ব্যপারে পুরো একটি সূরাই নাযিল করা হয়েছে: আল্লাহ তায়ালা বলেন: আমি একে নাযিল করেছি কদরে রাত্রিতে। কদরের রাত সমন্ধে আপনি কি জানেন! কদরের রাত্রি হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা কদর)
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে ‘লাইলাতুল কদর’ লাভ করার জন্য রমজানের শেষ দশরাত জাগ্রত থেকে ইবাদতে কাটিয়েছেন এবং উম্মতে মুহাম্মাদীকেও সারা রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগী করার নির্দেশ দিয়েছেন।
হযরত আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় রমযান মাসে সিয়াম পালন করবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় ‘ইবাদাতে রাত কাটাবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় লায়লাতুল কদরে ‘ইবাদাতে কাটাবে তারও আগের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (বুখারী - ২০১৫)
হযরত উবাদা ইবনুস সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, একদা রাসূল সাঃ আমাদেরকে লাইলাতুল কদর (নির্দিষ্ট তারিখ) অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দু’জন মুসলমান ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদরের সংবাদ দেয়ার জন্য বের হয়েছিলাম, তখন অমুক অমুক ঝগড়া করছিল, ফলে তার (নির্দিষ্ট তারিখের) পরিচয় হারিয়ে যায়। সম্ভবতঃ এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তোমরা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা তালাশ কর। ( বুখারী -২০২৩)
হযরত আয়েশা (রাযি.) হতে বর্ণিত: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তোমরা রমাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান কর। (বুখারী: ২০১৭)
অন্য একটি হাদিসে হযরত আয়েশা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি “লাইলাতুল কদর" জানতে পারি তাহলে সে রাতে কি বলব? তিনি বললেনঃ “তুমি বল, হে আল্লাহ! তুমি সম্মানিত ক্ষমাকারী, তুমি মাফ করতেই পছন্দ কর, অতএব তুমি আমাকে মাফ করে দাও" (তিরমিযী -৩৫১৩)
হযরত ‘আয়েশা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, রমাযানের শেষ দশক এলে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা রাতই জাগ্রত থাকতেন, (‘ইবাদাতের উদ্দেশে) শক্তভাবে কোমড় বাঁধতেন এবং পরিবারের লোকদের জাগাতেন।
(বুখারী -১৩৭৬)
এই রাতে কোরআন তেলাওয়াতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। পবিত্র এই রাতেই মহাগ্রন্থ আল কোরআন অবতীর্ণ হয়।
কোরআনের ভাষায় এ রাতের নাম ‘লাইলাতুল কদর’ মর্যাদাপূর্ণ মহিমান্বিত রাত। কোরআনেরই সংস্পর্শে এ রাত ‘লাইলাতুল কদর’ বা রজনীর অসাধারণ সম্মানে ভূষিত হয়েছে। কোরআনের সঙ্গে যাঁর যতটুকু সম্পর্ক ও সান্নিধ্য থাকবে, তিনি ততটুকু সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী হবেন। রাসুলে আকরাম (সা.) বলেন, ‘কোরআনওয়ালাই আল্লাহওয়ালা এবং তাঁর খাস ব্যক্তি ও
পরিবারভুক্ত।’ (বুখারি)। হাদিস শরিফে আরও এসেছে, ‘যার অন্তরে কোরআনের সামান্যতম অংশও নেই, সে যেন এক বিরান বাড়ি।’ (মুসলিম)।
শবে কদরে সূর্যাস্তের পরপরই আল্লাহ তাআলা আরশে আজিম থেকে প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের উদ্দেশে ডেকে ডেকে বলতে থাকেন, কে আছ পাপী ক্ষমা চাও, আমি ক্ষমা করে দেব, কে আছ দুঃখী আমি দুঃখ মোচন করে দেব, কে আছ রোগী আমি সুস্থ করে দেব, কে আছ দায়গ্রস্ত আমি দায়মুক্ত করে দেব, কার রিজিকের প্রয়োজন, আমি রিজিক বাড়িয়ে দেব। এভাবে চলতে থাকে সকাল পর্যন্ত। এ রাতে পরবর্তী এক বছরের জন্য মানুষের হায়াত, মউত, রিজিক-দৌলত বরাদ্দ হয় এবং ভাগ্য চূড়ান্ত হয়। কদরের রাতে নির্ধারিত ফরজ ইবাদতগুলো সযত্নে পালনপূর্বক সামর্থ্যমতো সর্বাধিক নফল ইবাদতের মাধ্যমে রাত্রি জাগ্রত করা সুন্নাত। প্রিয় রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের উদ্দেশ্যে আত্মমূল্যায়নসহ কদরের রাত জেগে ইবাদত করবে, তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩০, হাদিস: ৩৪; ই.ফা.)।
অতীতের সকল পাপ মোছনে এই কদরের রাত্রিই হোক আমাদের জাগরণ।

Comments: